Showing posts with label পলিটিক্স. Show all posts
Showing posts with label পলিটিক্স. Show all posts

হেফাজতের দাবি ও

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, হেফাজতের ১৩ দফা দাবির অনেকগুলো বাস্তবায়ন করা আছে। বাকি দাবিগুলোর মধ্যে যেগুলো যৌক্তিক, সেগুলো নিয়ে আলোচনা হবে।
আজ শুক্রবার গণভবনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে হেফাজতের ১৩ দফা দাবি নিয়ে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় তিনি হেফাজতের বিভিন্ন দাবি তুলে ধরে আলোচনা করেন।

সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম আছে
হেফাজতের প্রথম দাবি, সংবিধানে ‘আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপন এবং ‘কোরআন-সুন্নাহবিরোধী সব আইন বাতিল করা’ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ইসলাম ধর্ম সংবিধান থেকে বাদ যায়নি। বিসমিল্লাহ বলেই সংবিধান শুরু হয়েছে। সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম লেখা রয়েছে।

ধর্মের অবমাননার শাস্তির বিধান আছে
আল্লাহ, রাসুল (সা.) ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুত্সা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে জাতীয় সংসদে আইন পাস করতে হবে, হেফাজতের এই দাবির ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধর্মের অবমাননার বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান আমাদের স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্টে আছে। ২০০৯ সালে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইন করা হয়েছে। সেখানেও বিধান আছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ধর্ম ও আমাদের প্রিয় মহানবী (সা.)-এর বিরুদ্ধে কুত্সা রটনার জন্য এখন পর্যন্ত চারজন ব্লগারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সবার শাস্তি হবে।

নিরীহ আলেমদের গ্রেপ্তারের তালিকা দিন
শান্তিপ্রিয় নিরপরাধ আলেম ওলামাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, শাস্তিও হয়নি বলে দাবি করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ইসলাম পবিত্র ধর্ম। কেউ যদি ধর্মকে ব্যবহার করে জঙ্গিবাদী কাজে লিপ্ত হয়, তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি হেফাজতের উদ্দেশে বলেন, ‘নিরীহ আলেম ওলামা গ্রেপ্তারের তালিকা থাকলে জানাবেন, ব্যবস্থা নেব।’

ধর্ম পালনে কোথাও বাধা দেয়নি সরকার
বায়তুল মোকাররমসহ দেশের সব মসজিদে মুসল্লিদের নির্বিঘ্নে নামাজ আদায়ে বাধা বিপত্তি ও প্রতিবন্ধকতা অপসারণ এবং ওয়াজ নসিহত ও ধর্মীয় কার্যকলাপে বাধাদান বন্ধ করতে হবে—হেফাজতের এই দাবি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বায়তুল মোকাররম মসজিদসহ দেশের কোথাও ধর্ম পালনে কাউকে বাধা দেয়নি সরকার।

মোমবাতিতে অনীহা কেন?
হেফাজতের ইসলামের একটি দাবি হলো, ব্যক্তি ও বাকস্বাধীনতার নামে সব বেহায়াপনা, অনাচার, ব্যভিচার, প্রকাশ্যে নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ, মোমবাতি প্রজ্বালনসহ সব বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে হবে। এই দাবির ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন রেখে বলেন, মোমবাতির প্রতি তাঁদের এত অনীহা কেন? বিদ্যুত্ চলে গেলে সবাইকে মোমবাতি জ্বালাতে হয়। মোমবাতি ও মশাল ধর্মবিরোধী কোনো বিষয় নয়। পবিত্র মক্কা শরিফেও তাঁবুতে তাঁবুতে আলোর জন্য মশাল জ্বালানো হতো। ব্যভিচার আমরা পছন্দ করি না। ব্যভিচারের জন্য শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে।

সৌদি আরবে অনেক ভাস্কর্য আছে
হেফাজতের আরও একটি দাবি হচ্ছে, মসজিদের নগর ঢাকাকে মূর্তির নগরে রূপান্তর এবং দেশব্যাপী রাস্তার মোড়ে ও কলেজ-ভার্সিটিতে ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন বন্ধ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সৌদি আরবে অনেক ভাস্কর্য আছে। এ ব্যাপারে তারা অনেক পারদর্শী। এ ছাড়া সৌদি আরব, আরব আমিরাত ও আরব রাষ্ট্রগুলোতে ভাস্কর্যের উত্কর্ষ সাধিত হয়েছে। মূর্তি বানানো হয় হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজার জন্য। প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশে কোনো অশ্লীল ভাস্কর্য তৈরি করা হবে না।

ধর্মের পাশাপাশি পার্থিব শিক্ষা নিতে হবে
ইসলামবিরোধী নারীনীতি, ধর্মহীন শিক্ষানীতি বাতিল করে শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত ইসলাম ধর্মীয় শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে—এই দাবির ব্যাপারে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাদের সরকারের সময়ে প্রথম শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। এতে আমরা ধর্মীয় শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করেছি। যখন এটা করেছি, তখন তো কেউ এর বিরোধিতা করেন নাই।’ তিনি বলেন, ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি পার্থিব শিক্ষাও নিতে হবে।

নারীর অবমাননা হয়, এমন নীতি নয়
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নারী নীতিতে সংশোধন করে একটি লাইন যুক্ত করা হয়েছে। আমরা নারীর অবমাননা হয়, এমন কোনো নীতি প্রণয়ন করব না।’ তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ইসলাম ধর্ম প্রথম কে গ্রহণ করেছে? হজরত খাদিজা (র.)। তিনি একজন নারী। বিবি আয়শা নবীজির সঙ্গে থেকে যুদ্ধ করেছেন। হজরত খাদিজার ব্যবসা পুরো আবর বিশ্বে সুনাম কুড়িয়েছিল। ইসলামের জন্য যুদ্ধ করতে গিয়ে যিনি প্রথম শহীদ হন, তিনি একজন নারী, তাঁর নাম সুমাইয়া।

ইমাম, খতিবকে হুমকি দিলে ব্যবস্থা নেব
সারা দেশের কওমি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক, ওলামা-মাশায়েখ এবং মসজিদের ইমাম-খতিবকে হুমকি-ধমকি ও ভয়ভীতি দেখানোসহ তাঁদের বিরুদ্ধে সব ষড়যন্ত্র বন্ধ করতে হবে—এ দাবির ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কওমি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্টদের যদি কোনো ধরনের হুমকি দেওয়া হয়, তাহলে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আলেম ওলামাদের নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক প্রচার বন্ধ করা হবে
হেফাজতের অন্যতম একটি দাবি হলো—রেডিও, টেলিভিশনসহ বিভিন্ন মিডিয়ায় দাড়ি-টুপি ও ইসলামি কৃষ্টি কালচার নিয়ে হাসি-ঠাট্টা এবং নাটক-সিনেমায় খল ও নেতিবাচক চরিত্রে ধর্মীয় লেবাস-পোশাক পরিয়ে অভিনয়ের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের মনে ইসলামের প্রতি বিদ্বেষমূলক মনোভাব সৃষ্টির অপপ্রয়াস বন্ধ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে যেন ধর্মের বা ধর্মীয় লোকদের ব্যঙ্গাত্মকভাবে উপস্থাপন না করা হয়, সেজন্য সজাগ দৃষ্টি রাখা হবে। রেডিও-টেলিভিশনে আলেম-ওলামাদের নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক কোনো কিছু করা হলে, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং তা বন্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ধর্মের নামে জঙ্গিবাদী কাজ যেন না হয়
পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশব্যাপী ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত এনজিও এবং খ্রিষ্টান মিশনারিদের ধর্মান্তকরণসহ সব অপতত্পরতা বন্ধ করতে হবে—হেফাজতের এই দাবির প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে বলেন, পার্বত্য এলাকায় জোর করে ধর্মান্তরিত করা বন্ধে আইন অনুযায়ী কাজ করা হবে। পবিত্র ধর্মের নামে জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড যেন কেউ করতে না পারে, এ জন্য আলেম-ওলামাসহ সবার প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

হেফাজতে ইসলামের ১৩ দাবি

১। সংবিধানে ‘আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপন এবং কোরআন-সুন্নাহবিরোধী সব আইন বাতিল করতে হবে।

২। আল্লাহ, রাসুল (সা.) ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুত্সা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে জাতীয় সংসদে আইন পাস করতে হবে।

৩। কথিত শাহবাগী আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী স্বঘোষিত নাস্তিক-মুরতাদ এবং প্রিয় নবী (সা.)-এর শানে জঘন্য কুত্সা রটনাকারী কুলাঙ্গার ব্লগার ও ইসলামবিদ্বেষীদের সব অপপ্রচার বন্ধসহ কঠোর শাস্তিদানের ব্যবস্থা করতে হবে।

৪। ব্যক্তি ও বাকস্বাধীনতার নামে সব বেহায়াপনা, অনাচার, ব্যভিচার, প্রকাশ্যে নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ, মোমবাতি প্রজ্বালনসহ সব বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে হবে।

৫। ইসলামবিরোধী নারীনীতি, ধর্মহীন শিক্ষানীতি বাতিল করে শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত ইসলাম ধর্মীয় শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে।

৬। সরকারিভাবে কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা এবং তাদের প্রচারণা ও ষড়যন্ত্রমূলক সব অপতত্পরতা বন্ধ করতে হবে।

৭। মসজিদের নগর ঢাকাকে মূর্তির নগরে রূপান্তর এবং দেশব্যাপী রাস্তার মোড়ে ও কলেজ-ভার্সিটিতে ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন বন্ধ করতে হবে।

৮। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমসহ দেশের সব মসজিদে মুসল্লিদের নির্বিঘ্নে নামাজ আদায়ে বাধাবিপত্তি ও প্রতিবন্ধকতা অপসারণ এবং ওয়াজ-নসিহত ও ধর্মীয় কার্যকলাপে বাধা দেওয়া বন্ধ করতে হবে।

৯। রেডিও, টেলিভিশনসহ বিভিন্ন মিডিয়ায় দাড়ি-টুপি ও ইসলামী কৃষ্টি-কালচার নিয়ে হাসি-ঠাট্টা এবং নাটক-সিনেমায় খল ও নেতিবাচক চরিত্রে ধর্মীয় লেবাস-পোশাক পরিয়ে অভিনয়ের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের মনে ইসলামের প্রতি বিদ্বেষমূলক মনোভাব সৃষ্টির অপপ্রয়াস বন্ধ করতে হবে।

১০। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশব্যাপী ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত এনজিও এবং খ্রিষ্টান মিশনারিদের ধর্মান্তকরণসহ সব অপতত্পরতা বন্ধ করতে হবে।

১১। রাসুলপ্রেমিক প্রতিবাদী আলেম-ওলামা, মাদ্রাসাছাত্র এবং তৌহিদি জনতার ওপর হামলা, দমন-পীড়ন, নির্বিচার গুলিবর্ষণ এবং গণহত্যা বন্ধ করতে হবে।

১২। সারাদেশের কওমি মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষক, ওলামা-মাশায়েখ এবং মসজিদের ইমাম-খতিবকে হুমকি-ধমকি ও ভয়ভীতি দানসহ তাঁদের বিরুদ্ধে সব ষড়যন্ত্র বন্ধ করতে হবে।

১৩। অবিলম্বে গ্রেপ্তারকৃত সব আলেম-ওলামা, মাদ্রাসাছাত্র ও তৌহিদি জনতাকে মুক্তিদান, দায়ের করা সব মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার এবং আহত ও নিহতদের ক্ষতিপূরণসহ দুষ্কৃতকারীদেরকে বিচারের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি দিতে হবে।


হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবি সম্পর্কে আজ শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যকে স্ববিরোধী ও পাশ কাটিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা বলে মন্তব্য করেছেন সংগঠনের আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী। আজ রাতে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি এ মন্তব্য করেন।
বিবৃতিতে কোনো রকম বিভ্রান্তির শিকার না হয়ে পূর্ণ উদ্যম ও প্রস্তুতি নিয়ে আগামী রোববার ‘ঢাকা অবরোধ’ কর্মসূচিতে অংশ নিতে বলা হয়েছে। তবে, সাভার দুর্ঘটনায় লাশবাহী গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স, উদ্ধার তত্পরতায় নিয়োজিত সব ধরনের যান, দেশি-বিদেশি পরিদর্শকদের গাড়িসহ এ জাতীয় যানবাহন অবরোধের আওতা মুক্ত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়।
দীর্ঘ বিবৃতিতে হেফাজতকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া সব বক্তব্যের জবাব দেন আহমদ শফী। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে কাল শনিবার সকাল ১১টার দিকে লালবাগে সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়েছে।
বিবৃতিতে আহমদ শফী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে হেফাজতের ১৩ দফা দাবি সম্পর্কে গ্রহণযোগ্য কোনো মত ও দিক-নির্দেশনা পাওয়া যায়নি। বরং বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর বক্তব্যে স্ববিরোধী ব্যাখা ও পাশ কাটিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে জাতিকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টাই ছিল বিশেষভাবে লক্ষণীয়। সে কারণেই আমরা আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে ৫ মে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি যথারীতি বহাল রাখার প্রত্যয় ঘোষণা করছি।’
বিবৃতিতে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে স্ব-বিরোধিতার বহু নজির ফুটে উঠেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার ‘সংবিধানবিরোধী’ ও ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলার পরও প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন দফার সঙ্গে একমত পোষণ করে প্রচলিত আইনে কী কী ধারা-উপধারা রয়েছে তাও উল্লেখ করেছেন। আবার সংবিধানে ‘আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ পুনঃস্থাপনের বিষয়টি পাশ কাটিয়ে ‘রাষ্ট্র ধর্ম’ ও ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ উল্লেখ থাকার কথা বলে ওই মৌলিক বাক্যটি পুণঃস্থাপন করা নিয়ে কোনো কথা বলা হয়নি। ইসলামের অবমাননা ও কটূক্তির বিষয়ে প্রচলিত ‘ধর্ম অবমাননা আইন’ ‘স্পেশাল পাওয়ার অ্যাক্ট’ এবং ‘তথ্য প্রযুক্তি আইনের’ ধারায় বর্ণিত শাস্তির কথা তুলে ধরলেও সর্বোচ্চ শাস্তির আইন প্রণয়ন বিষয়ে কোনো কথা বলেননি। গ্রেপ্তার করা চারজন ব্লগারের বিরুদ্ধেও বিদ্যমান আইনে কঠোর কোনো ধারায় মামলা করা হয়নি।
বলা হয়, আলেম উলামা, ইমাম, খতিব ও মাদরাসার ছাত্রদের হয়রানি, হুমকির বিষয়টির সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী অজ্ঞতা প্রকাশ করলেও বাস্তবতা হচ্ছে, এ পর্যন্ত আন্দোলনরত প্রায় দশ জন আলেমকে হত্যা করা হয়েছে। বহু আলেম খতিবকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, বহু মাদ্রাসা বাধ্যতামূলক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আর ভাস্কর্য ও মূর্তির মধ্যে ব্যবধান তৈরি করে প্রধানমন্ত্রী যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তার সঙ্গে ইসলামের অবস্থান ও নীতির কোনো সম্পর্ক নেই। এক্ষেত্রে কোনো কোনো আরব দেশের উদাহরণ টেনে ইসলাম ভাস্কর্যকে উত্কর্ষ দান করেছে বলে যে কথা বলা হয়েছে, তা ইসলামের শিল্পনীতি সম্পর্কে একটি ভুল ব্যাখ্যা।
নারীনীতি, নারী-অধিকার, অশ্লীলতা, ব্যভিচার ইত্যাদি বিষয়ে ইসলামী অনুশাসনের প্রশংসা করে আবার নারীনীতির ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ধারার বিষয়গুলো পাশ কাটিয়ে গেছেন প্রধানমন্ত্রী।


হাসিনা খালেদার মিল-অমিল


কাজল ঘোষ: দু’নেত্রীর মিল-অমিল খুঁজতে যাওয়া সত্যিই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। পাশ্চাত্য দুনিয়ার মিডিয়ায় দু’জনই ব্যাটলিং বেগমস বলে শিরোনাম হয়েছেন একাধিকবার। আদতে জনগণও তাই দেখছে। সুযোগ পেলেই রাজনীতির অ আ না বুঝা মানুষও বলে ওঠেন এরাই সব শেষ করলো। দেশটার বারোটা বাজালো। মিল শুধুই কি তাহলে ওখানে। ইতিহাসের পাতা উল্টালে আরও অনেক ক্ষেত্রেই দু’ নেত্রীকে এক কাতারে দাঁড় করানো যায়। ভাঙা-গড়ার খেলা নিয়েই দু’জন দেশের শীর্ষ আসনটি বাগিয়ে নিচ্ছেন। শুরু করেছেন খালেদা জিয়া। অনেকটা নাটকীয় ও সব হিসাব বদলে দিয়ে হয়েছিলেন প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। নব্বইয়ের গণআন্দোলনে সবাই ভেবেছিলেন পনের দলীয় জোট নেত্রী হাসিনাই হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু না। ভোটের বাক্সে এগিয়ে গেলেন সাত দলীয় জোট নেত্রী খালেদা জিয়া। মন খারাপ করে, ব্যর্থতা নিয়ে শেখ হাসিনা সেবার দল থেকে পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। বাদ সাধলেন দলের নেতাকর্মীরা। এটাই ছিল টার্নিং পয়েন্ট। ধীরে ধীরে মোড় ঘুরিয়ে দিলেন রাজনীতির। বিএনপির প্রথম জমানায় মাগুরা নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে রাজপথে সরব হলেন। সকল বিরোধী পক্ষকে এক কাতারে নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুললেন। আপসহীন নেত্রীর খেতাব পাওয়া খালেদা জিয়াকে দাবি মানতে বাধ্য করলেন। ক্ষমতায় এলেন। তারপর মুদ্রার এপিট আর ওপিট। দু’জনই ক্ষমতায় এসেছেন পরপর চারবার। মাঝখানে অল্পদিনের জন্য খালেদা জিয়া আরও একবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন।  সব হিসেব গড়মিল করে দিলো ওয়ান-ইলেভেন। দু’জনই কারাগারে কাটালেন। কাছাকাছি সময়ে কাছাকাছি বসবাস। রাজনীতিতে নানা সংস্কারের আওয়াজ। দু’দলেই অস্থিরতা। ফৌজি শাসনের ছায়ায় দেশ চললো দু’বছর। রাজনীতিকরা একের পর এক বন্দি হলেন। নতুন কিছু পকেট দলের সূচনাও ঘটলো। দু’নেত্রীর নামে একাধিক মামলা হলো। বিচার চললো। রাজনীতিতে মীর জাফর, মদন লাল আর রাজবল্লভদের চেনা হলো। জনগণ মুখিয়ে উঠলেন গণতন্ত্রের জন্য। মিডিয়া একাই লড়লো জনগণের অধিকার ফিরিয়ে দিতে। দু’জনই মুক্ত হলেন। একজন ধানমন্ডির সুধাসদনে আর অন্যজন নয়াপল্টনে দলের কার্যালয়ের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে কাঁদলেন। নতুন ভাবনায় দেশকে এগিয়ে নেয়ার কথা বললেন। তারপরের কথাতো সবারই জানা। সরব হলো রাজনীতির মাঠ। নতুন হিসাব-নিকাশ।  নির্বাচন হলো। বঙ্গবন্ধু কন্যা ক্ষমতায় এলেন। একজন প্রধানমন্ত্রীর আসনে। অন্যজনের দু’পুত্র মামলার বেড়াজালে দেশের বাইরে। একাকিত্ব। দলের শোচনীয় পরাজয় মাথায় নিয়ে নিজেকে গড়তে লাগলেন। জনগণের ভোটের লড়াইয়ে হাসিনার ফর্মুলা কব্জা করেই রাজপথের লড়াইয়ে নয়া শক্তি নিয়ে হাজির হলেন। রোডমার্চ আর জনসংযোগে জনগণকে সংঘটিত করতে লাগলেন। অন্যদিকে খালেদার আপসহীন তকমা গায়ে লাগালেন হাসিনা।
খালেদাকে এক সকালে ছাড়তে হলো স্মৃতি বিজড়িত মঈনুল রোডের বাড়ি। সংবাদ সম্মেলনে কাঁদলেন। জনতার কাছেই বিচারের ভার তুলে দিলেন। হাসিনাকেও বাড়ি ছাড়তে হয়েছিল প্রথম জমানায় ক্ষমতায় ছাড়ার অল্পকাল পর। শেষ মুহূর্তে গণভবন লিখে নিয়েছিলেন এক অধ্যাদেশে। চারপাশে সমালোচনা হয়েছিল। নিরাপত্তার খাতিরে তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি বঙ্গবন্ধু পরিবার। বিএনপি ক্ষমতায় এসে তা বাতিল করলে তাকেও বেরিয়ে যেতে হয়েছিল গণভবন থেকে। অ™ভূত রকমের মিল দু’ নেত্রীরই। জ্যোতিষীরা বরাবরই এক নেত্রী ক্ষমতায় থাকলে অন্য নেত্রীর রাজনীতিতে সুফল পাবার সম্ভাবনার কথা বলেন। আশঙ্কার পাল্লা ভারি রাখেন ক্ষমতায় যিনি থাকেন তার জন্য। দু’নেত্রীর ভবিষ্যৎ নিয়ে ওয়ান ইলেভেনে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হয়েছে। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সংস্কারপন্থিদের নানা ফর্মুলায় তার রূপরেখা আঁকা হয়েছে। বিএনপির প্রয়াত মহাসচিব মান্নান ভূঁইয়া তার দেয়া সংস্কার প্রস্তাবে নির্দিষ্টভাবেই বেগম জিয়াকে মাইনাস করার কথা বলেছিলেন। এর আগে শেখ হাসিনা ৬০ বছরের সময়সীমা বেঁধে দিয়ে কার্যত নিজেকে সরিয়ে নেয়ার রূপরেখা দিয়েছিলেন। দু’জনের পারিবারিক জীবনও আচানক একই রকমের ঘটনায় আন্দোলিত। একজন পঁচাত্তরের নির্মমতা বুকে নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। রেহানা ছাড়া পরিবারের সবাইকে হারিয়েছেন। অন্যজন স্বামী প্রেসিডেন্ট থাকা অবস্থায় শহীদ হয়েছেন সেই কষ্ট বুকে নিয়েই পথ চলেছেন। বর্তমানে দুজনেরই সন্তান-সন্ততিরা বিদেশ বিভুইয়ে। হাসিনা পুত্র-কন্যা জয় পুতুল বাইরেই আছেন অনেককাল। খালেদা জিয়ার দু’পুত্র তারেক কোকো ওয়ান-ইলেভেনে কারাগার থেকে চিকিৎসার জন্য বাইরে গেলে আর ফিরতে পারেননি। দু’জনের রাজনীতিতে আবির্ভাব সত্যিই নাটকীয়। জনগণ যতই দু’নেত্রীকে দোষারোপ করুক দেশ পরিচালনার ব্যর্থতা নিয়ে। কিন্তু রাজনীতিকরাই তাদের হালুয়া-রুটির ভাগ নিতে দু’জনকে দলের দায়িত্বে নিয়ে এসেছেন। আওয়ামী লীগ-বিএনপির দুর্যোগে দু’জনই দলের হাল ধরেছেন। খালেদা জিয়া ছিলেন আটপৌরে গৃহবধূ। দেশের সশস্ত্র বাহিনীর পদস্থ কিংবা পরে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী হয়েও প্রকাশ্যে খুব কমই দেখা গেছে। দলের শীর্ষ নেতাদের অনুরোধে ১৯৮৩ সালে দলের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে রাজনীতিতে অভিষেক।  এরপর দলের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব নেয়ার পর আর পিছনে ফিরে তাকাননি। জেনারেল এরশাদের সময় স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে সামরিক সরকারের অধীনে নির্বাচনের না যাওয়ার ঘোষণায় অটল থেকে অর্জন করেছিলেন আপসহীন নেত্রীর পরিচিতি। ১৯৮৩ থেকে ২০১৩ সাল। সকল প্রতিকূলতায় দলের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব নিয়ে কখনও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হননি। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও দলের শীর্ষ নেতাদের অনুরোধেই দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। দূর প্রবাসে গৃহবধূর জীবন যাপন করছিলেন। পঁচাত্তরের পনেরই আগস্ট ট্রাজেডি মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল হাসিনার জীবনে। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায়। দলের প্রবীণ নেতাদের কথায় নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটান। দায়িত্ব নেন সভানেত্রীর। নানা উত্তান-পতনের খেলায় দলকে ২১ বছর পর ক্ষমতায় আনেন ১৯৯৬-তে। দলের ভাঙন আর সংস্কারের নানা মোর্চাতেও বৃহৎ এই দলের নেতৃত্ব নিয়ে কখনও চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হননি। রাজনীতির কৌশল হিসেবে দু’নেত্রীই বিতর্কিত দল ও নেতৃত্বকে কাছে ভিড়িয়েছেন আবারও সমভাবে দূরেও ঠেলে দিয়েছেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে মাঠে একসঙ্গে আন্দোলনে করেছে অওয়ামী লীগ জামায়াতের সঙ্গে। ক্ষমতায় এলে লক্ষ যোজন দূরে ঠেলে দেয়া হয়েছিল জামায়াতকে। বিএনপির প্রথম জমানায় আওয়ামী লীগই ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ব্যানারে গড়ে তুলেছিলেন যুদ্ধাপরাধ বিচারে তীব্র আন্দোলন। নানা বিতর্ক সত্ত্বেও এবার ক্ষমতায় এসে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তা শুরু করেছেন। অন্যদিকে বিএনপি আরও একধাপ এগিয়ে। ক্ষমতায় যেতে রাজপথে জোট গড়েই তারা ক্ষ্যান্ত হয়নি। ক্ষমতার অংশীদার করেছে গাড়িতে তুলে দিয়েছে জাতীয় পতাকাও। দু’নেত্রী স্বৈরাচার এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলেছেন। নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে পতন ঘটিয়েছেন।  কিন্তু চাকা ঘুরতেই এরশাদকেও ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি করতে দু’দলই নানাভাবে ব্যবহারের চেষ্টা করেছে। বর্তমান সরকারও মহাজোট গড়েছে এরশাদকে নিয়ে। তারই ভাই জিএম কাদেরকে করেছে মন্ত্রী। নানা সুবিধা প্রাপ্তি বিবেচনায় এরশাদও  আজ এটা তো কাল ওটা বলে কখনও সকার বিরোধী আবারও কখনও সরকারের দুঃসময়ের কাণ্ডারি হতে চেয়েছেন।
নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। আলোচনার নানা ডালপালা গজাচ্ছে। দেশ একর পর এক দুর্যোগে আবর্তিত হচ্ছে। সবেশেষ সাভার ট্রাজেডির নির্মমতায় দেশ কাঁদবে বহুকাল। শুধু অশ্রুপাতই কি এর সমাধান। দু’নেত্রী ছুটে গেছেন সাভারে। স্বজনহারাদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। বিরোধী নেত্রী এই নির্মমতার সঙ্গে যুক্তদের বিচারে অন্য দাবির সঙ্গে যুক্ত করে একদিনের হরতাল ডেকেছিলেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আহবানে তিনি হরতাল প্রত্যাহার করে উদারতার পরিচয় দিয়ে রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছেন। সকল দুঃখ জাগানিয়া দুঃসময়েও এটি আমাদের জন্য ভালো খবর। সময় নেননি প্রধানমন্ত্রী। সংসদে দাঁড়িয়ে বিরোধীদলকে এজন্য ধন্যবাদ দিয়ে সৌজন্য অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। বিরোধী নেত্রী প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে দু’কথা লিখেছেন। ভবিষ্যৎ সঙ্কট সমাধানে জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় প্রধানমন্ত্রীকে সাড়া দিতে আহ্বান জানিয়েছেন। আমজনতা অপেক্ষায় কি হয় তা দেখার জন্য। দেশের সকল মানুষ দু’নেত্রীকে উ™ভূত পরিস্থিতি দেখকে দেশকে সামনে এগিয়ে কার্যকরী উদ্যোগে দেখতে চান। পালাপাল্টি গালমন্দের সংস্কৃতি বদলে ধন্যবাদের উদার প্রচলন প্রত্যাশা করে।
হাসিনা খালেদা তাদের জীবদ্দশায় রাজনীতিতে অপাংক্তেয় হয়ে যাবেন এই চিন্তা বাস্তবতা বিবর্জিত। সংস্কারের প্রয়োজন আমাদের চিন্তা চেতনায়। বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার নিজস্ব স্বতঃস্ফূর্ত উদার ও দেশদরদী সিদ্ধান্তই হতে পারে সহজ, কার্যকর ও সুবিধাজনক সমাধান। কথায় আছে, দুর্যোগ সুযোগ এনে দেয়। আমাদের একেকটি দুর্যোগে ব্যাপক সংখ্যক মানুষের এগিয়ে আসা; অকাতরে নিজেকে বিলিয়ে দেয়া প্রমাণ করে এ জাতি শত প্রতিকূলতাতেও ঘুরে দাঁড়াতে পারে।

ধর্মীয় দলগুলোর দফার চাপে সরকার

ধর্মীয় রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সংগঠনের বিভিন্ন 'দফার রাজনীতির' চাপে পড়েছে সরকার। রাষ্ট্রের সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও অগণতান্ত্রিক বেশ কিছু দফা থাকার পরও সংগঠনগুলো তাদের এ দাবি মেনে নিতে প্রতিনিয়ত চাপ প্রয়োগ করছে সরকারকে। নানা কর্মসূচি পালন ও ঘোষণার মধ্য দিয়ে তারা এক ধরনের চরম রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করছে। ফলে দফা ভিত্তিক এ রাজনীতি ভাবিয়ে তুলছে সরকারকে।

এর মধ্যে গণজাগরণ মঞ্চের ৬ দফা, ধর্মীয় সংগঠন আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের ১২ দফা, হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা এবং রাজনৈতিক দল ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশ ২১ দফা ঘোষণা করে।

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত, ইসলামিক ফ্রন্ট এবং হেফাজতে ইসলাম মতাদর্শিক দিক দিয়ে দুই পক্ষের দুই মেরুতে অবস্থান। এখন দুই পক্ষই সরকারকে দফা ১২ ও ১৩ দিয়ে তা বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে। একদিকে হেফাজত অন্যদিকে আহলে সুন্নাত। দুই পক্ষই ধর্মীয় অনুভূতির কথা বলছে। এ নিয়ে বিপাকে সরকার। চার পক্ষের দাবি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আহলে সুন্নাত ও ইসলামিক ফ্রন্টের দাবির মধ্যে অনেক দফার মিল রয়েছে। গণজাগরণ মঞ্চ, আহলে সুন্নাত ও ইসলামিক ফ্রন্ট যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবি করছে। হেফাজত এ দাবি সম্পর্কে নিশ্চুপ। আবার গণজাগরণ মঞ্চ ছাড়া তিন পক্ষই আল্লাহর ওপর আস্থা ও পূর্ণ বিশ্বাস রাখার বিষয়টি সংবিধানে সংযোজন করার দাবি জানায়। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আত 'সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে দেশকে চলমান গভীর সংকট থেকে উত্তরণের পদক্ষেপ গ্রহণ, দেশ, জাতি ও মানবতার বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্দক এবং নৈরাজ্যকর কর্মসূচি হরতাল বন্ধে জাতীয় সংসদে আইন পাসের' দাবি করছে। হেফাজতের এ ধরনের দাবি নেই। তবে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্তা, ইসলাম ও নবী (সা.) নিয়ে কটূক্তিদের সর্বোচ্চ শাস্তি, কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণার কথা দুই পক্ষের দাবির মধ্যেই রয়েছে। হেফাজত সম্পূর্ণ নারী নীতি বাতিলের দাবি করলেও আহলে সুন্নাত কেবল কোরআন-সুন্নাহ বিরোধী অংশ বিশেষ বাদ দেওয়ার দাবি জানায়। একই দাবি ইসলামিক ফ্রন্টেরও। আহলে সুন্নাত 'স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের সরাসরি বিরোধিতাকারী জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ, যুদ্ধাপরাধের বিচার দাবি করলেও হেফাজত এ দাবি করে নাই। শাহবাগের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত সবাইকে নাস্তিক ও মুরতাদ মনে করে না ইসলামিক ফ্রন্ট ও আহলে সুন্নাত। তারা মনে করে যারা ব্লগে ইসলাম ও নবী (সা.) নিয়ে কটূক্তি করেছেন চিহ্নিত সেই সব ব্লগাররাই নাস্তিক। পক্ষান্তরে হেফাজতে ইসলাম মনে করে 'কথিত শাহবাগী আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী সবাই স্বঘোষিত নাস্তিক-মুরতাদ'। ইসলামিক ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব সোলায়মান ফরিদ বলেন, আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, চিহ্নিত ব্লগারদের শাস্তি, ইসলাম ও নবী (সা.)-এর শানে কটূক্তিকারী, কওমি মাদ্রসার আলেম কর্তৃক নবী (সা.)-এর শানে অবমাননাকর বক্তব্যদানকারীদের শাস্তি চাই। কারণ নবী (সা.) নিয়ে তারাই বহু বছর আগে থেকেই কটূক্তি করে আসছে। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা'আতের প্রেসিডিয়াম সদস্য এম এ মতিন বলেন, আমরা যে ১২ দফা দিয়েছি সেগুলো সম্পূর্ণ নিজস্ব অবস্থান থেকে ইসলাম, দেশ, জাতি এবং দেশের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিবেশ নিরসনের লক্ষ্যে। এখানে আমরা কাউকে প্রতিপক্ষ মনে করি না। আর আমাদের দাবি ন্যায্য, জরুরি এবং দেশ-জাতির জন্য কল্যাণকর। আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ জানাব তারা যেন আমাদের দাবিগুলো বিবেচনা করে দেশে শান্তি পরিবেশ ফিরিয়ে আনে। তবে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, এসব দাবির মধ্যে কিছু দফা রাষ্ট্র ও গণতন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে এ সব দাবি বাস্তবায়ন রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব হবে না। এর মধ্যে প্রকাশ্যে নারী-পুরুষের বিচরণ, মোমবাতি প্রজ্বলন, দেশব্যাপী রাস্তার মোড়ে ও কলেজ-ভার্সিটিতে ভাস্কর্যের নামে মূর্তি স্থাপন বন্ধ, নারী নীতি সম্পূর্ণ বাতিল করা, কাদিয়ানি ইস্যুসহ বিভিন্ন দাবি বাস্তবায়ন করা রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব হবে না। সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন চট্টগ্রামের আহ্বায়ক প্রফেসর মু. সিকান্দার খান বলেন, বিভিন্ন পক্ষের দেওয়া দাবিগুলো জনগণ, রাষ্ট্র বা সরকারের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনবে না। এগুলো যে যার মতো করে উপস্থাপন করছে, এর মাধ্যমে যে যার স্থান দখল করে নিচ্ছে। এগুলো তাদের নিজস্ব ধারণ ও বর্ণনা। দেশ ও জাতিকে এসব দাবি দিয়ে কোনোভাবেই সামনের দিকে নিয়ে যাবে না।

Link

একজন ‘বাইচান্স’ সম্পাদক এবং ফোর্থ স্টেট

সাজেদুল হক: মিন্টো রোডের নতুন ঠিকানায় কেমন আছেন মাহমুদুর রহমান- তা অনুমান করা যায়, অনুভব করা না গেলেও। এ পরিস্থিতিতে পড়তে পারেন সে আশঙ্কা তার ছিল। চার মাস আগে যখন নিজ কার্যালয়ে বন্দি হলেন তখন ‘এক অবরুদ্ধ বাইচান্স সম্পাদকের জবানবন্দিতে’ বয়ান করেছিলেন সে কথা। ঈমান নিয়ে মৃত্যুই ছিল তার একমাত্র চাওয়া। তবে আপাত ১৩ দিনের রিমান্ড জীবনের শুরুতে অভাবনীয় দু’টি দুঃসংবাদ পেয়েছেন তিনি। চার বছর ধরে তার সম্পাদনায় প্রকাশিত দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে অশালীন কৌশলে। পত্রিকাটির প্রেস সিলগালা করে দেয়ার পর বিকল্প ব্যবস্থায় প্রকাশনার চেষ্টা করেন সংবাদকর্মীরা। কিন্তু বিকল্প প্রেসে হানা দিয়ে সেখান থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সব প্রেস কর্মীকে। মাহমুদুর রহমানের বৃদ্ধ মাতাকেও এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আসামি করা হয়েছে। যিনি ছেলের গ্রেপ্তারের পর আমার দেশ পাবলিকেশন্সের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করছিলেন। স্রোতের বিপরীতের যাত্রী মাহমুদুর রহমান যখন বৃহস্পতিবার সকালে গ্রেপ্তার হন তখন নানা তাত্ত্বিক প্রশ্নের ওপর আলোচনা আবার নতুন করে শুরু হয়েছে। ৫৯ বছর বয়সী এ ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক পেশায় ছিলেন প্রকৌশলী। ছাত্র জীবন কাটিয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ ইন্সটিটিউটে। তিনি প্রথম প্রচারের আলোয় আসেন বিগত-বিএনপি জামায়াত জোট সরকারের জমানায়। খালেদা জিয়া সরকারের জ্বালানী উপদেষ্টার দায়িত্ব বর্তায় তার ওপর। জরুরি জমানার কঠিন সময়ে কলাম লেখক হিসেবে আবির্ভাব ঘটে মাহমুদুর রহমানের। ফখরুদ্দীন সরকারের তীব্র সমালোচনা করে দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লেখা শুরু করেন তিনি। একপর্যায়ে আমার দেশ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। সরকারের তীব্র সমালোচনামূলক লেখার কারণে রোষানলে পড়েন ক্ষমতাবানদের। প্রধানমন্ত্রীর ছেলের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করা হয় তার পত্রিকায়। গ্রেপ্তার হন মাহমুদুর রহমান। আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হন সুপ্রিম কোর্টে। ছয় মাসের কারাদণ্ড আর এক লাখ টাকা জরিমানার রেকর্ড সাজা দেয়া হয় তাকে। নয় মাস কারাভোগের পর সেদফায় মুক্তি মিলে তার। সে মামলার শুনানিকালেই একজন বিচারপতি তাকে অভিহিত করেন বাইচান্স এডিটর হিসেবে। মাহমুদুর রহমান আবার আলোচনার শীর্ষে চলে আসেন যখন চার মাস পূর্বে তার পত্রিকায় বিচারপতি নিজামুল হকের স্কাইপ কথোপকথন ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হয়। যে সংবাদের জেরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে পদত্যাগ করেন বিচারপতি হক। তবে মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধেও দায়ের করা হয় মামলা। সেসময় থেকে নিজ কার্যালয়েই বন্দি জীবন কাটাতে থাকেন। এরইমধ্যে ঘটে যায় শাহবাগ অভ্যুত্থানের মতো ঘটনা। শুরুর দিন থেকে একমাত্র আমার দেশই সরব থাকে এ অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে। শাহবাগে ফ্যাসিবাদের পদধ্বনির খবর দেয় পত্রিকাটি। একসময় মঞ্চে আবির্ভাব ঘটে হেফাজতে ইসলামের। দমবন্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় পুরো রাষ্ট্রেই। এ অবস্থায় পুরনো মামলায় আবার গ্রেপ্তার হলেন মাহমুদুর রহমান। টিভি টকশোতে অনেক বিজ্ঞ সম্পাদক তার সাংবাদিকতার পরিচয় নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই মাহমুদুর রহমানও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। নবম সংসদ নির্বাচনের আগে তার ব্যবসায়িক কার্যালয়ে শীর্ষ আমলাদের বৈঠক সমালোচনার ঝড় তুলেছিল। মাহমুদুর রহমানের নিজের এবং তার পত্রিকায় প্রকাশিত লেখায় আক্রমণাত্মক উপাদান অনেক ক্ষেত্রেই সাংবাদিকতার সীমা লঙ্ঘন করেছে। কিন্তু মাহমুদুর রহমানের গ্রেপ্তারে যারা উল্লাস প্রকাশ করছেন দুই দিন আগেও ব্লগারদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার পক্ষে সাফাই গেয়েছেন তারা। এই বুঝি বাঙালি মুসলমানের মন। এই শিক্ষিতজনরা নিশ্চয়ই ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ারের সেই অমর উক্তির সঙ্গে পরিচিত। তিনি বলেছিলেন, আমি তোমার মতের সঙ্গে একমত না হতে পারি, কিন্তু তোমার মত প্রকাশের অধিকার আমি জীবন দিয়ে হলেও রক্ষা করবো। তবে মাহমুদুর রহমানের গ্রেপ্তারের চেয়ে বড় আঘাত এসেছে ফোর্থ স্টেট খ্যাত সংবাদ মাধ্যমের ওপর। পুলিশি হানায় আমার দেশ পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ হয়ে গেছে। আইন আদালত কোন কিছুরই তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। মামলা করা হয়েছে সংগ্রাম সম্পাদক আবুল আসাদের বিরুদ্ধেও। আরও কিছু সংবাদ মাধ্যম বন্ধের গুঞ্জনও ছড়িয়ে পড়েছে। এ ইঙ্গিত কারও জন্যই শুভ নয়। যারা ভাবছেন, অন্ধ হলেই প্রলয় বন্ধ থাকবে তারা ভুল করছেন। এ প্রলয় একদিন আপনার বাড়িতেও আঘাত হানতে পারে। এ অন্ধকার সময়ে একটি কথাই বারবার ফিরে আসছে, ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড়শিক্ষা হলো এই যে মানুষ ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে না।’